আল— হজ্ব : ৩০ থেকে ৩৯
আল কুরআন (আল— হজ্ব : ৩০ থেকে ৩৯) ৩০. এগুলো (হজ্বের বিধান)। এ ছাড়া যে, আল্লাহ এবং পবিত্র (স্থান ও অনুষ্ঠান) সমূহের প্রতি সম্মান দেখাবে, তার প্রভ...
বিস্তারিতনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন
সাঈদ ইবনু আবদুর রহমান মাখযূমী রা. আব্বাদ ইবনু তামীম তৎপিতৃব্য আবদুল্লাহ্ ইবনু যায়দ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয...
বিস্তারিতবাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলো
নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুস এর নেতৃত্বে বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলো। নিঃসন্দেহে এই সরকার একটি বিপ্লবোত্তর সরক...
বিস্তারিতমূলঃ আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহ)
অনুবাদঃ ড.
হাসান মুহম্মদ মঈনুদ্দীন
তায়াক্কুল এর
অর্থ হল ভরসা করা,
নির্ভরশীল হওয়া। কুরআন এবং হাদিসে তাওয়াক্কুলের বিষয়টি
বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আল্লাহ
বলেন, ‘তোমরা
আল্লাহর
প্রতি তাওয়াক্কুল কর,
যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকো।’ (আল মায়েদা ঃ
২৬) ‘ঈমানদারদের
কর্তব্য হল আল্লাহর
প্রতি তাওয়াক্কুল করা।’
(সূরা ইব্রাহীম ঃ ১২) ‘যে আলাহর
প্রতি তাওয়াক্কুল করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।’ (সূরা আততালাক ঃ
৩) আলাহর
ওলীগণ বলেন, হে
আমাদের রব, আমরা
আপনার উপর ভরসা করি,
আরো আপনার দিকে ধাবমান থাকি এবং আপনারই নিকট আমাদের
প্রত্যাবর্তন। (সূরা মুমতাহিনা ঃ ৪) আপনি বলুন, তিনিই রহমান, তার প্রতি আমরা
ঈমান এনেছি আর আমরা তার উপর ভরসা করি।’ (সূরা নিসাঃ ২৯) আর আপনি আলাহর উপর ভরসা
করুন এবং আলাহর
উপর ভরসা করাই যথেষ্ট।’
(সূরা নিসাঃ ৮১)
আর আপনি চিরঞ্জিব। আলাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন যিনি মরেন না এবং আপনি তার প্রশংসার তাসবীহ পড়–ন। (সূরা আল ফুরকান ঃ ৫৮) যখন আপনি কোন কাজের দৃঢ়তা পোষণ করেন তখন আলাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন। নিশ্চয় আলাহ তাওয়াক্কুলকারী বান্দাদের মহব্বত করেন।’ (আলইমরান ঃ ১৯৫) নবীগণ বলেন, আমাদের কি হল যে, আলাহর উপর আমরা তাওয়াক্কুল করব না। অথচ তিনি আমাদেরকে হিদায়াতের পথ প্রদর্শন করেছেন? (সূরা ইব্রাহীম ঃ ১২) ‘লোকেরা যখন তাদের (মুমেনদের) বলল, আপনাদের বিরুদ্ধে জনবল ঐক্যবদ্ধ করা হয়েছে, সুতরাং আপনারা তাদের ব্যাপারে ভিত থাকুন, তখন তারা বলল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম অভিভাবক। (সূরা আল ইমরান ঃ ১৭৩) তারাই ইমানদার যাদের নিকট আলাহর যিকির উচ্চারণ করা হলে তাদের অন্তর নরম হয়, যখন তাদের সামনে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা হয় তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় সুতরাং তারা আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে। (সূরা আনফালঃ ২)
এভাবে সম্পূর্ণ কুরআন তাওয়াক্কুলের আয়াতে ভরপুর। রাসূলুলাহ (সাঃ) এর উপনাম সমূহের মধ্যে একটি আল মুতাওয়াক্কিল। সে হিসেবে আলাহর প্রতি তার তাওয়াক্কুল ছিল সবাইর চেয়ে বেশী। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতে উলেখিত ‘আপনি আলাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন, নিশ্চয় আপনি সুস্পষ্ট সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। (সূরা আননামলঃ ৭৯) উলেখিত আয়াতে আলাহর উপর নবীজির যেমন সম্পূর্ণ তাওয়াক্কুল ছিল তেমনি তিনি ছিলেন দ্বীনে হকের উপর দৃঢ় এবং অনড়। এরদ্বারা প্রতিয়মান হল যে, দ্বীন ইসলাম মূলত দুটি গুনের উপর প্রতিষ্ঠিত। আর একজন মুমেনের মধ্যে এ দুটি গুন থাকা অপরিহার্য।
প্রথমতঃ তিনি
কথায় কাজে বিশ্বাসে ও নিয়তের দ্বারা দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার প্রমাণ দেবেন, দ্বিতীয়তঃ আলাহ তায়ালার উপর
সম্পূর্ণ তাওয়াক্কুলকারী থাকবেন। কোন কোন লোক হিদায়াত প্রাপ্ত বটে কিন্তু
তাওয়াক্কুল থেকে বঞ্চিত। আবার কতেক লোক তাওয়াক্কুলকারী কিন্তু হিদায়াতের উপর
প্রতিষ্ঠিত না। অতএব দুজনই বিপদগ্রস্ত। আর যার মধ্যে দুটি গুন বিদ্যমান সে যেন
পূর্ণাঙ্গ ঈমান ও পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের অধিকারী। সহীহাইনে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুলাহ (সাঃ)
বলেছেন, সত্তর
হাজার লোক বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর তারা হলো যারা তাবিজ তামার করে না, কাওকে দিয়ে
করায় না, আর
তারা কোন কিছুকে শুভ অথবা অশুভ লক্ষণ হিসেবে গ্রহণ করে না এবং আলাহর উপর যারা
তাওয়াক্কুল করে। সহীহ বুখারীতে ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, কুরআনের বাণী
(হাসবুনালাহ ওয়া
নিমাল ওয়াকিল, নিমাল
মাওলা ওয়া নিমান নাসির) এ বাক্যটি ইব্রাহীম আঃ তখন উচ্চারণ করেছিলেন যখন তাকে
অগ্নিকুন্ডলীতে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। একই বাক্যটি নবী মুহাম্মদ (সাঃ) উচ্চারণ
করেছিলেন যখন লোকেরা তাকে বলল,
তোমাদের সাথে মোকাবেলা করার জন্য লোকেরা সমাবেশ করেছে বহু
সাজ-সরাঞ্জম সুতরাং তাদের ভয় করুন। তিনি বলেছিলেন, হাসবুনালাহু ওয়া নিমাল
ওয়াকিল নিমাল মাওলা ওয়া নিমান নাসীর। (সূরা আলইমরানঃ ১৩৭)
সহী হাইনে উলেখিত হাদিসে নবী করিম সাঃ বলেছেন, হে আলাহ আমি আপনার জন্য সবকিছু সম্পূর্ণ করলাম, আপনার প্রতি ঈমান আনলাম, আপনার উপর তাওয়াক্কুল করলাম, আপনার দিকে ধাবিত হলাম ও আপনার সাহায্যে শত্র“ মোকাবেলা করলাম। হে আল্লাহ আপনার ইজ্জতের দ্বারা আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থী। আপনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। আমাকে যেন কেউ গুমরাহ না করতে পারে। আপনিই চিরঞ্জীব, আপনার মৃত্যু নেই তবে জীন এবং ইনসানের মৃত্যু অবধারিত।
তিরমিযিতে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত মারফু হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, তোমরা যদি আলাহর প্রতি পরিপূর্ণ এবং সত্যিকার অর্থে তাওয়াক্কুল কর তবে তিনি তোমাদের রিযিক প্রদান করবেন যেমন তিনি আকাশের উড়ন্ত পাখীদের রিযিক প্রদান করেন। এ সকল পাখীরা সকালে নিজ নিজ বাসা থেকে বের হয় আবার বেলা শেষে ভরা পেটে নিজ নিজ বাসায় ফিরে আসে।
আনাস (রাঃ) হতে সুনানে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কুলতু আলাল্লাহ ওয়ালা হাউলা ওয়ালা কুয়্যাতা ইল্লাবিল্লাহ।’
তখন বলা হবে
তুমি পথ প্রদর্শিত,
তুমি নিরাপত্তা প্রাপ্ত এবং তুমি যথেষ্ট। (আলাহ তোমার জন্য
যথেষ্ট) পক্ষান্তরে তখন শয়তান পরস্পরে বলাবলি করে যে, যে লোকটি পথ
প্রদর্শিত, নিরাপত্তা
প্রাপ্ত ও যথেষ্ট তাকে নিয়ে তোমরা কিবা করতে পারবে।
তাওয়াক্কুল হচ্ছে দ্বীনের অর্ধেকাংশ। আর তার দ্বিতীয়াংশ হচ্ছে রবের দিকে সদা ধাববান থাকা। দ্বীন ইসলাম হলো সাহায্য চাওয়া ও ইবাদতে লিপ্ত থাকা। অতএব তাওয়াক্কুলের অপর নাম হলো সাহায্য চাওয়া। আর আলাহর দিকে ধাবিত থাকার অপর নাম হলো ইবাদতে লিপ্ত থাকা। মোটকথা আলাহর ইবাদত ও তার দাসত্বে সর্বদা লিপ্ত থাকাই হল তাওয়াক্কুল।
সর্বোত্তম
তাওয়াক্কুল হলো আলাহ
কর্তৃক অর্পিত দায়ীত্ব পালন করা,
জনসাধারনের প্রতি নিজ কর্তব্য পালন করা এবং সেই সঙ্গে নিজের
নাফসের প্রতি নিজ কর্তব্য পালন করা। মূলত এ সমস্ত দায়ীত্ব পালনের মধ্য দিয়ে
অম্বিয়া কেরাম তাওয়াক্কুলের হক আদায় করেছিলেন। তাদের তাওয়াক্কুল ছিল এ যমীনে দ্বীন
কায়েম করার মধ্যে এবং যমীন থেকে সব ধরনের ফিতনা ফাসাদ নির্মূল করার মধ্যে। আর
তাওয়াক্কুলের এ নিয়মটি তারা নিজ নিজ উম্মতদেরকে মিরাস হিসেবে দিয়ে গেছেন।
তাওয়াক্কলের সজ্ঞাঃ
ক. ইমাম আহমদের (রহঃ) দৃষ্টিতে তাওয়াক্কুল হল, সম্পূর্ণ কলবের আমল। অর্থাৎ এটি জিহবা অথবা মুখের সাথে সম্পৃক্ত না আর না এটি পঞ্চইন্দ্রিয়ের দ্বারা করবার মত কাজ। বরং এটা নিখুঁত মনের কাজ। এটি স্পর্শ করা ও জ্ঞানের দ্বারা বুঝবার জিনিষও নয়।
খ. কেউ কেউ বলেন, তাওয়াক্কুল জিনিসটি জ্ঞান অর্জনের সাথে সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ কালবের জ্ঞান হচ্ছে তাওয়াক্কুল যেটা আলাহর পক্ষ থেকে কোন বান্দাকে দেয়া হয়।
গ. কতেক লোক এর
অর্থ এভাবে করেছেন,
কলবের নড়া-চড়াকে সম্পূর্ণ বন্ধ করে তাকে শিথিল করে রাখা।
সম্পূর্ণ আলাহর
ইচ্ছার উপর এবং তাকদীরের চলমান ফয়সালার উপর নিজেকে ন্যস্ত করে দেয়া। যেখানে স্ব
ইচ্ছার কোন অবকাশ থাকে না। বিখ্যাত সূফী সাধক আব্দুলাহ আত তাসতুরী
(রহঃ) তাওয়াক্কুলের অনুরূপ ব্যাখ্যা করেছেন।
ঘ. কোন কোন
ব্যক্তি বলেছেন,
তাওয়াক্কুল অর্থ হচ্ছে সবকিছু আলাহর ইচ্ছের উপর
ছেড়ে দেয়া এবং তাকদীরের ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা।
ঙ. কতেক আলেম বলেছেন, তাওয়াক্কুল মানে হচ্ছে সকল সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে কেবল আলাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন অব্যাহত রাখা।
তাওয়াক্কুলের
জন্য কতিপয় করণীয় ঃ আসলে তাওয়াক্কুল হলো একটি গাড়ীর মত বস্তু। গাড়ীর চেচিস, চাকা, ইঞ্জিন, আসন, মেশিন ও
যন্ত্রপাতির সমন্বয়ের একটি বডির মত। এগুলোর যে কোন একটিকে গাড়ী বলা হয় না।
সামুষ্টিক সবগুলোকেই গাড়ী বলা হয়। তদ্রুপ তাওয়াক্কুলের নাম হলো কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ
বিষয়গুলো এক সাথে পাওয়া যাওয়া। সেগুলো হচ্ছে-১. রবকে চেনা, তাঁর সম্পর্কে
মোটামুটি জ্ঞান থাকা,
২. তাওয়াক্কুলের সাথে সাথে প্রয়োজনীয় সম্বল সঙ্গে রাখা, ৩. এক আলাহর উপর
তাওয়াক্কুল করা,
৪. তার দিকে সবসময় ধাবিত হওয়া, ৫. তাঁর প্রতি
সদা সুধারণা রাখা,
৬. সব সময় তার কাছে নমনীয় থাকা, ৭. তার কাছে সব
কিছু সোপর্দ করা,
৮. এবং সর্বদা তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। প্রথমতঃ যেহেতু
কেবলমাত্র আলাহর
উপর পূর্ণ ভরসা ও তাওয়াক্কুল করতে হয় সেহেতু আলাহ সম্পর্কে
বান্দার স্পষ্ট ও স্বচ্ছ বিশ্বাস থাকতে হবে। তার একক স্বত্ত¡া ও একক
গুণাবলির উপর পূর্ণ বিশ্বাস থাকা বাঞ্চনীয়। সুতরাং যে লোক আলাহর স্বত্ত¡া, নাম ও গুণাবলির
সঠিক জ্ঞান যতবেশী রাখবে তার প্রতি তার তাওয়াক্কুল ততবেশী সঠিক ও পরিপূর্ণ থাকবে।
দ্বিতীয়ত ঃ তাওয়াক্কুলের সাথে সাথে মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সম্বল ও আসবাবপত্র থাকা প্রয়োজন। সুতরাং যে তাওয়াক্কুল করল, সেই সঙ্গে তদবির করল না প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও পদক্ষেপ নিল না, সে তাওয়াক্কুলের স্বীকারোক্তি করলো না। আলাহর উপর তাওয়াক্কুলের অর্থ হচ্ছে প্রয়োজনীয় সম্বল সংগ্রহ করা অর্থাৎ তাওয়াক্কুলের পর তার কাছে দোয়া চাওয়া। তাওয়াক্কুল মানে এটা নয়, রিযিকের সন্ধান ছাড়া হাত গুটিয়ে বসে থাকা। বরং ক্ষুধা নিবারনের জন্য খাইতে হবে, পিপাসা মিটানোর জন্য পানির সন্ধান করতে হবে। যদি কেও খেতে না চায়, পান করতে না চায় তবে আলাহ তাকে এমনিতে খাওয়াবেন না ও পানও করাবেন না। সুতরাং উদ্দেশ্যে পূরন করতে হলে সেটার জন্য চেষ্টা তদবির ও মেহনত করতে হবে। হজ্জ পালন ও মক্কা সফর করতে হলে তাকে যেকোন বাহনে চড়তে হবে। তাওয়াক্কুল করে বসে থাকলে হজ্জ করা অসম্ভব ও মক্কায় পাড়ি দেয়াও অসম্ভব। অনুরূপ আলাহর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জান্নাতে যেতে হলে ইসলামের পথ ধরতে হবে এবং আমল করতে হবে। নইলে জান্নাত পাওয়া কঠিন। জমিতে শস্য পেতে হলে চাষাবাদ করতে ও বীজ লাগাতে হবে ও মেহনত করতে হবে। কেবল ঘরে বসে থাকলে নিজে নিজে ফসল ঘরে এসে যাবে না। কতেক মুর্খ লোক তাওয়াক্কুলের অপব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় সম্বল যোগান ও চেষ্টা তদবির করাকে উড়িয়ে দেয়। আরো বলে তকদীরে যা আছে তাই হবে। তকদীরে ক্ষুধা লিখিত থাকলে আমার করার কিছু নেই। রাসূলুলাহ (সাঃ) বদর, ওহুদ যুদ্ধের সময় হাত গুটিয়ে বসে বিজয়ের প্রত্যাশা করেননি। বরং যুদ্ধ বিজয়ের জন্য তিনি অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধের পোষাক পরে বিজয়ের প্রত্যাশা করেছেন। হিজরত করার সময় তিনি মদীনার পথ চেনবার জন্য একজন মুশরিকের সহায়তা নিয়েছিলেন। মানবকুলের মধ্যে সবচেয়ে বেশী তাওয়াক্কুলকারী হওয়া সত্তে¡ও তিনি নিজ পরিবারের জন্য বছরের খাদ্য যোগান দিয়েছেন। যেকোন সফরের সময় তিনি আসবাব পত্র সঙ্গে রাখতেন।
তৃতীয়ত ঃ আলাহর প্রতি তাওয়াক্কুল করতে হলে নিজ মনকে একমাত্র আলাহর জন্য সন্নিবেশীত করা প্রয়োজন। সমস্ত শিরক, বিদআত চিন্তা থেকে নিজমনকে পরিষ্কার করতে হবে। তাওয়াক্কুল করার পর গাইরুলাহর প্রতি ভরসা করার মানে তার অন্তর একত্ববাদের প্রতি বিশ্বাসী নয়। বরং তার অন্তর বিভিন্ন দিকে বিভক্ত।
চতুর্থত ঃ সব সময় আলাহর দিকে ধাবমান থাকা। তার আশ্রয় ছাড়া অন্য কারোর আশ্রয় চাওয়ার চিন্তা না করা। এমতাবস্থায় তাওয়াক্কুলকারীর মনে কোন অস্থিরতা থাকবে না। যেকোন চেষ্টা তদবিরের সময় মনের মধ্যে বিন্দুমাত্র সংশয় থাকবেনা। কোন ব্যাপারে শঙ্কিত থাকবেনা। মূলত যে আলাহকে একমাত্র নিজ আশ্রয়স্থান মনে করে তার কোনই চিন্তা থাকেনা। এর একটি সুন্দর উদাহরণ হল যেমন, একটি শিশু মায়ের বুকের দুধ পেলে সে মনে করে যে সবকিছু পেয়ে গেছে। মায়ের কোল ছাড়া আর কিছুই সে চায়না। তাই একজন সুফী সাধক বলেন, মুতাওয়াক্কিল ব্যক্তি মায়ের কোলের শিশুর মত। আলাহর নৈকট্য ছাড়া সে আর কোথাও আশ্রয়স্থান আছে বলে জানেনা।
পঞ্চমঃ আলাহর প্রতি শুধারনা রাখা। মানুষ আলাহর প্রতি যে পরিমাণ ভাল ধারনা পোষণ করে সে পরিমাণ সে তার প্রতি প্রত্যাশা করতে পারে। অনুরূপ তার প্রতি তাওয়াক্কুলও করতে পারে। তাই দেখা যায় যে, কেউ কেউ তাওয়াক্কুলের ব্যাখ্যা দিয়েছেন আলাহর প্রতি শুধারনা দিয়ে। আর সত্য কথা বলতে গেলে খারাপ ধারণা পোষনের দ্বারা কারুর প্রতি তাওয়াক্কুল করা অসম্ভব। তেমনি করে অসম্ভব তার প্রতি ভাল কোন কিছুর প্রত্যাশা করা।
ষষ্ঠঃ সর্বদা আলাহর নিকট মাথানত অবস্থায় থাকা। অর্থাৎ তার সামনে আত্মসমর্পনকারী হয়ে থাকা। শুধু মুখে আত্মসর্ম্পনের কথা বলা যথেষ্ট না বরং মনে প্রাণে এবং সত্যিকার অর্থে তার কাছে নিজেকে সম্পর্ন করা। এখানে আত্মসর্ম্পন বলতে আলাহর তদবিরের ও সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আস্থাশীল থাকা। কেননা যেকোন উদ্দেশ্য হাসেল করতে হলে নিজের মধ্যে কর্মক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। আর এই কর্মক্ষমতা সম্পূর্ণ আলাহর কাছে রয়েছে। একেই বলা হয় আলাহর তাওফিক লাভ করা। কোন ব্যাপারে আলাহর প্রতি তাওয়াক্কুল করার পর সে বিষয়টি হাসিল করতে হলে আলাহর পক্ষ থেকে তাওফিক থাকতে হবে। তিনি তো স্বয়ং কারুর জন্য তদবিরের জন্য মাঠে নামতে পারেন না। বরং সেই বান্দাকে দিয়ে তদবির করাবেন। অতএব যে আলাহর প্রতি তাওয়াক্কুল করার পর তার প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসর্ম্পন করবে এবং তার কাছ থেকে কর্মক্ষমতা বা তাওফিক চাই সেই সত্যিকার অর্থেই মুতাওয়াক্কিল।
সপ্তমঃ তাওয়াক্কুলের অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি আলাহর উপর সবকিছু ছেড়ে দেয়া। পক্ষে বা বিপক্ষে ফয়সালা দেয়ার মালিক তাই সে বিষয়টি তার উপর ন্যস্ত করে দেয়া। ছয় নম্বর ও সাত নম্বরের বিয়ষটির পার্থক্য বুঝতে হলে একটি উদাহরণ সামনে রাখতে হবে। যেমন একজন দুর্বল ও অপারগ সন্তান তার নিজের সকল দায় দায়ীত্ব যখন তার পিতার উপর ছেড়ে দেয় তখন এতটুকু বিশ্বাস তার মধ্যে থাকে যে, আমার বাবা আমার ভাল মন্দের ব্যাপারে অবহিত। সন্তান হিসেবে তার প্রতি বাবার øেহ, মমতা রয়েছে। তিনি সন্তানের মঙ্গলটাই দেখবেন। ক্ষতিকারক কিছু তিনি আদৌ করতে পারেনা। তিনি যা করতে পারেন কেবল ছেলের স্বার্থের জন্যই করতে পারেন। সাধারণ নির্বোধ, দুর্বল ও অক্ষম সন্তানরাই বাবার প্রতি এ ধরনের সুধারনা রাখে এবং তার নিজের সমস্ত দায়-দায়ীত্ব বাবার উপর ন্যস্ত করে। তদ্রুপ মহান আলাহর প্রতি তাওয়াক্কুল কেবল ঐ বান্দাই করতে পারে। যে আলাহর সার্বিক সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট যদিও নিজের কাছে সেটা অপছন্দীয় বলে মনে হয়। কেননা বান্দার জন্য কোনটা কল্যাণজনক আর কোনটা অকল্যাণ জনক সেটা কেবল তিনি জানেন যার জ্ঞান ক্ষমতা অসীম। সুতরাং আমরা দেখতে পাই যে, ফেরাউনের নির্যাতনের সম্মুখীন হয়ে ঈমানদারগণ বললেন, আমরাত আলাহর কাছে আমাদের সব বিষয়গুলো সোপর্দ করলাম। (সূরা আল গাফের ঃ ৪৪) সত্যকথা বলতে গেলে, আলাহর কাছে সব ন্যস্ত করার মধ্যে তাওয়াক্কুলের পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়া যায়।
অষ্টম ঃ
তাওয়াক্কুল করার পর যে কোন ফলাফলের প্রতি পুরোপুরি সন্তুষ্ট থাকা। একজন মানুষের আলাহর প্রতি
তাওয়াক্কুল কি পরিমাণ নিখূত ও স্বচ্ছ তার সঠিক প্রমাণ পাওয়া যায়। তাওয়াক্কুলের
পরিমানের প্রতি তার রেযা বা সন্তুষ্টি। আমার শিক্ষক আলামা ইবন
তাইমিয়্যাহ রহঃ বলেছেন,
তাওয়াক্কুলের দুটি পর্যায়ে রয়েছে। এক. কোন কাজ আরম্ভ করার
পূর্বে তাওয়াক্কুল করা। দুই. কাজটি সম্পন্ন হবার পর তাওয়াক্কুল করা। অতএব
দুপর্যায়ের তাওয়াক্কুল সাব্যস্ত হবার পর লোকটি আলাহর ইবাদতের হক
আদায় করতে সক্ষম হয়েছে বলে বুঝতে হবে। তবে আমি বলবো যে, এ দুটি পর্যায়ে
রাসূলুলাহ
(সাঃ) ইস্তেখারার দোয়ার বিদ্যমান পাওয়া যায়। দোয়াটি হলো, ‘আলাহুম্মা ইন্নি
আসতাখিরুকা বি-ইলমিকা,
ওয়া আসতাকদিরুকা বিকুদরাতিকা ওয়া আসআলুকা মিন ফাদলিকাল
আযীম। কাইন্নাকা তালামু ওয়ালা আলামু ওয়া তাকদিরু ওয়ালা আকদির ওয়া আনতা আলামুল গুযূব
....। অর্থ হে আলাহ আমি
আপনার জ্ঞানের আলোকে আপনার সদিচ্ছা কামনা করি। আপনার কুদরতের দ্বারা আপনার সাহায্য
চাই। আপনার অসীম দয়ার প্রার্থনা করি। আপনি জানেন আমি জানি না। আপনি শক্তি রাখেন
আমি শক্তি রাখিনা এবং আপনিও সকল অদৃশ্যের সমস্ত কিছু অবগত।
মোটকথা হচ্ছে উপরে উলেখিত আটটি বৈশিষ্ট যার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে তার তাওয়াক্কুল পরিপূর্ণতা লাভ করবে। কেবল সেই তাওয়াক্কুলের উপর দৃঢ় থাকতে পারবে। বিশরুল হাফী নামক একজন সূফী সাধক কতইনা মূল্যবান কথা বলেছেন যে, যে লোক কেবল তাওয়াক্কুলতু আলালাহ (আলাহর উপর ভরসা করছি) বলে কিন্তু তার ব্যাপারে আলাহর আচরণে সন্তুষ্টি না তার এ দাবীটি ইমানের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
তাওয়াক্কুল ইমানের একটি অংশঃ তাওয়াক্কুল না থাকলে ইমান থাকে না। সুতরাং যার মধ্যে তাওয়াক্কুল নেই তার ঈমান নেই। যেমন আয়াতে উলেখিত আলাহর উপর তোমরা তাওয়াক্কুল কর যদি তোমরা ঈমানদার হও। (সূরা মায়েদা ঃ ১৩) তিনি আরো বলেছেন, কেবল ইমানদারগণ আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে। (সূরা ইব্রাহীম ঃ ১৩) আরেক জায়গায় তিনি বলেছেন, মুমেন লোক তারা যাদের সামনে আলাহর যিকির করার সময় তাদের অন্তর বিগলিত হয় আর যখন আয়াত তিলাওয়াত করা হয় তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধিপায় এবং তারা আলাহর উপর তাওয়াক্কুল করে। (সূরা আলআনফালঃ ২) আল্লাহর সকল নবী-রাসূল আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলকে জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য বানিয়েছিলেন।
দ্বিতীয়তঃ মহান আলাহ
তাওয়াক্কুলকারী বান্দাকে অত্যন্ত ভালবাসেন। যেমনভাবে তিনি শোকরগুজার তওবাকারী ও
ধৈর্য্যশীল বান্দাদের অত্যন্ত ভালবাসেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আর আলাহপাক এ ধরনের
বান্দাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যান এবং তিনি স্বয়ং তাদের পুরস্কৃত করবেন। এটা তার জন্য
সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য।
নিয়ত পরিশুদ্ধ রাখা কেন অনিবার্য ভাবে প্রয়োজন? ‘সাইয়িদুনা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘সমস্ত কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। ব্যক্তি তাই পাবে, যা সে নিয়ত করবে। অতএব, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সন্তুষ্টির) জন্য হিজরত করেছে, তার হিজরত (বাস্তবিকই) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য হয়েছে। আর যে ব্যক্তির হিজরতের (উদ্দেশ্য) ছিল, দুনিয়া উপার্জন বা কোনো নারীকে বিয়ে করা তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই গণ্য হবে।’ (সে আখিরাতে কোনো সাওয়াব পাবে না।) (সূরা মুমিনুন: ১১৫)
লা মাযহাবির পক্ষ থেকে আর একটা প্রশ্ন করা হয়, ইমামগণ সাধারণ মানুষ; তারা তো নবী না। আর সবাই একমত যে নবী ছাড়া প্রতিটি মানুষ যত বড়ই ইমাম হোক সবাই সঠিক করতে পারে আবার ভুল করতে পারে। তাই আমি এমন একজন মানুষকে কিভাবে মানবো যে সঠিক করতে পারে আবার ভুল করতে পারে। ইমামকে মানা ওয়াজিব করে দেওয়া মানে একটা ভুল কাজ
যাবতীয় কল্যাণ, সর্বপ্রকার জ্ঞান-গরিমা, প্রজ্ঞা ও রহস্যের আধার হল আল কুরআন। একে অনুসরণ করেই দুনিয়া ও আখিরাতে পাওয়া যায় সুখের সন্ধান, মেলে সঠিক পথের দিশা। আল কুরআন মহান আল্লাহর বাণীর অপূর্ব সমাহার বিস্ময়কর এক গ্রন্থের নাম। আল কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ সংরক্ষিত এক সংবিধান। আল্লাহ তা‘আলা জিবরাঈল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে সুদীর্ঘ ২৩ বছরে মানব জাতির হিদায়াত হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন তার নাম আল কুরআন। এই কুরআন যেমন সমগ্র মানব জাতির মানসিক সংশয়, সন্দেহ, অস্পষ্টতা, কুপ্রবৃত্তি, লোভ-লালসা নামক নানা রকম রোগ-ব্যাধি নিরাময়ের অব্যর্থ মহৌষধ ঠিক তেমনি দৈহিক রোগ-ব্যাধি, বেদনা, কষ্ট-ক্লেশ এবং জীবন চলার পথের সকল অন্ধকার বিদূরিত করার এক অনবদ্য নির্দেশিকা। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, ‘আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা রোগের প্রতিষেধক এবং মুমিনদের জন্য রহমত।’ (বনী ইসরাঈল : ৮২) এই কুরআন হল, সত্য-মিথ্যা এবং বৈধ-অবৈধের সীমা-রেখা
যাবতীয় প্রশংসা কেবলই আল্লাহ তা‘আলার যিনি সমগ্র জগতের মালিক ও রব। আর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের ওপর, যিনি সমস্ত নবীগণের সরদার ও সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী। আরও বর্ষিত হোক তার পরিবার-পরিজন ও সমগ্র সাথী-সঙ্গীদের ওপর। মনে রাখতে হবে, অহংকার ও বড়াই মানবাত্মার জন্য খুবই ক্ষতিকর ও মারাত্মক ব্যাধি, যা একজন মানুষের নৈতিক চরিত্রকে শুধু কলুষিতই করে না বরং তা একজন মানুষকে হেদায়াত ও সত্যের পথ থেকে দূরে সরিয়ে ভ্রষ্টতা ও গোমরাহির পথের দিকে নিয়ে যায়। যখন কোনো মানুষের অন্তরে অহংকার ও বড়াইর অনুপ্রবেশ ঘটে, তখন তা তার জ্ঞান, বুদ্ধি ও ইরাদার ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে এবং তাকে নানাবিধ প্রলোভন ও প্ররোচনার মাধ্যমে খুব শক্ত হস্তে টেনে নিয়ে যায় ও বাধ্য করে সত্যকে অস্বীকার ও বাস্তবতাকে প্রত্যাখ্যান করতে। আর একজন অহংকারী সবসময় চেষ্টা করে হকের