গল্পের নাম: ছায়ার ভেতরে আলো
লেখক: মোঃ ইকবাল হোসেন মোল্যা
১
সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। গ্রামের ছোট্ট স্কুলের শিক্ষক রফিক স্যার প্রতিদিনের মতো সাইকেল নিয়ে বের হলেন। তবে আজ তাঁর চোখে এক অদ্ভুত চিন্তার ছায়া। গত কয়েকদিন ধরে স্কুলের এক ছাত্র, সোহেল, ক্লাসে আসছে না। ছেলেটি নাকি বাবার সঙ্গে বাজারে কাজ করছে—এই খবরটা শুনে তাঁর মনটা অস্থির হয়ে আছে।
রফিক স্যার জানেন, সোহেলের বাবা দিনমজুর। সংসারের টানাপোড়েনে ছেলেটাকে কাজে নামাতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু সোহেল ছিল ওদের ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র। ছোট চোখে বড় স্বপ্ন ছিল তার—“আমি একদিন বড় অফিসার হব, স্যার।”
এই কথাটা রফিক স্যারের কানে এখনো বাজে।
---
২
দুপুরে স্কুল ছুটি দিয়ে রফিক স্যার সোজা গেলেন সোহেলদের বাড়ি। খড়ের ছাউনি, টিনের বেড়া, সামনেই একটা নিমগাছ। গাছের নিচে বসে সোহেল বেতের ঝুড়ি বুনছে। মাথায় ঘাম, চোখে হতাশা।
রফিক স্যার কাছে গিয়ে ডাকলেন, “কী রে সোহেল, স্কুলে আসিস না কেন?”
সোহেল চুপ। হাতের কাজ থামায় না। পাশে বসে থাকা তার মা বললেন,
“স্যার, ওর বাপরে তো হাসপাতালে নিতে হবে, কিডনির সমস্যা। তাই ছেলেটারে কাজে নামাইছি। খাওন জোটে না স্যার, বই কিনে কী করব?”
রফিক স্যার এক মুহূর্ত চুপ করে থাকলেন। তারপর খুব শান্ত স্বরে বললেন,
“বই কেনার চিন্তা তোমরা করো না। আমি বইটা এনে দেব। কিন্তু ওকে স্কুলে ফেরাও। ওর মধ্যে আমি আলো দেখেছি।”
---
৩
পরের সপ্তাহেই রফিক স্যার নিজের বেতনের টাকায় সোহেলের বই-খাতা কিনে দিলেন।
ছেলেটি আবার স্কুলে ফিরল। প্রথম দিকে সবাই অবাক, কিন্তু ধীরে ধীরে সোহেলের পুরোনো উচ্ছ্বাস ফিরে এল।
একদিন স্কুলে রচনা লিখতে দেওয়া হলো—বিষয় ছিল “আমার স্বপ্ন”।
সোহেল লিখল,
> “আমি বড় হয়ে দরিদ্রদের জন্য হাসপাতাল বানাব, যেন কেউ আর টাকার অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়।”
রফিক স্যারের চোখে জল এসে গেল। নিজের পুরোনো কষ্ট যেন ছেলেটার চোখে পড়ল।
---
৪
বছর ঘুরে বছর যায়। সময়ের নদী বহমান।
সোহেল এখন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। সরকারি বৃত্তি পেয়ে পড়ছে।
প্রতিবার গ্রামের ছুটি এলে সে স্কুলে যায়, রফিক স্যারের হাত ধরে বলে,
“স্যার, আপনি না থাকলে আমি আজ এই জায়গায় থাকতাম না।”
রফিক স্যার মৃদু হেসে বলেন,
“তুই শুধু ভালো মানুষ হ, তাতেই আমার পুরস্কার।”
---
৫
এক রাতে রফিক স্যার অসুস্থ হলেন। বৃদ্ধ বয়সে নিঃসঙ্গ জীবনে তাঁর দেখার কেউ নেই।
গ্রামের ডাক্তাররা বলল, ঢাকায় নিতে হবে। কিন্তু কে নেবে?
তখন খবর পেয়ে ছুটে এল সোহেল। এখন সে ডাক্তার সোহেল আহমেদ।
নিজের গাড়িতে করে স্যারকে ঢাকায় নিল। সেরা হাসপাতালে ভর্তি করল।
রফিক স্যারের চোখ ভিজে গেল। বিছানায় শুয়ে বললেন,
“তুই আমার জীবনের আলো রে সোহেল। অন্ধকারের ভেতর থেকেও আমি তোর মতো আলোর মানুষ পেয়েছি।”
সোহেল হাত ধরে বলল,
“না স্যার, আপনি ছিলেন সেই আলো, যার ছায়া ধরে আমি মানুষ হতে শিখেছি।”
---
৬ (উপসংহার)
এক মাস পর রফিক স্যার মারা যান।
গ্রামের স্কুলে তাঁর নামে একটি ভবন তৈরি হয় — “রফিক মেমোরিয়াল ভবন।”
উদ্বোধনের দিনে সোহেল বক্তৃতায় বলল,
> “আমরা অনেকেই আলো খুঁজি, কিন্তু ভুলে যাই—আলো আসলে একেকজন মানুষের হৃদয়ে জ্বলা একটি প্রদীপ। রফিক স্যার সেই প্রদীপ ছিলেন, যিনি অন্ধকারের মধ্যেও অন্যদের আলোকিত করে গেছেন।”
দর্শকরা নিঃশব্দে শুনল। বাতাসে হালকা কুয়াশা, গাছের পাতায় সূর্যের ঝলকানি।
মনে হচ্ছিল, সত্যিই হয়তো ছায়ার ভেতরেও আলো থাকে—যদি কেউ তা জ্বালিয়ে দেয়।
**গল্পের বার্তা ও নৈতিক শিক্ষা
১️⃣ ছায়ার ভেতরে আলো
গল্পের বার্তা:
প্রত্যেক মানুষের জীবনেই ছায়া থাকে, কিন্তু সেই ছায়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটুকরো আলো। একজন শিক্ষক শুধু জ্ঞান দেয় না, তিনি মানুষকে নিজের আলো খুঁজে নিতে শেখান।
নৈতিক শিক্ষা:
সত্যিকারের শিক্ষা জীবনের অন্ধকার দূর করে।শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্ক হৃদয়ের বন্ধন।আত্মবিশ্বাস হারালে আশার আলোও নিভে যায়।যে আলো অন্যকে দেয়, তার নিজের আলো নিভে না।মানবতা শেখার সবচেয়ে বড় বিদ্যালয় হল জীবন।
— লেখক:
মোঃ ইকবাল হোসেন মোল্যা
পিতা: মোঃ হানিফ মোল্যা
গ্রাম ও ডাকঘর: মাঝিগাতী
ভায়া: রামদিয়া কলেজ
উপজেলা: মুকসুদপুর, জেলা: গোপালগঞ্জ
পোস্ট কোড: ৮১৩১, বাংলাদেশ
মোবাইল: +8801313644198
ই-মেইল: iqbalhossainffcl@gmail.com
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: উপরোক্ত লেখাটি মোঃ ইকবাল হোসেন মোল্যা এর অপ্রকাশিত গল্পগ্রন্থ জীবনের আলো থেকে নেয়া)