সম্পাদকীয়

মানুষ আল্লাহর সেরা জীব। আশরাফুল মাখলুকাত। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আ.......

বিস্তারিত পড়ুন

আল-কুরআন

(২৩৯ ডিসেম্বর ২০১৮ সংখ্যাব পর)১৮. তুমি ধারণা করবে তারা জাগ্রত, অথচ তারা ঘুমন্ত। আমরা তাদের পাশে পরিব.......

বিস্তারিত পড়ুন

আল-হাদীস

হযরত আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তো.......

বিস্তারিত পড়ুন
Card image cap

প্রশ্নোত্তরে ইসলামী ব্যাংকিং

 

(মে ২০১৭, ২২৩ সংখ্যার পর) 

বাণিজ্যিক ঋণ দিয়ে অতিরিক্ত আদায় করা সুদ কি না

প্রশ্ন-১১: আল কুরআন নাযিলের সময় দেশে উৎপাদনশীল ও বাণিজ্যিক ঋণের প্রচলন ছিল না দাবি করে কেউ কেউ বলেন যে, আল কুরআনে কেবল ভোগ্যঋণের সুদ নিষিদ্ধিকরা হয়েছে। এ ছাড়া সাধারণত বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণ করে ধনীরা। তারা এ ঋণ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করে। তাই বলা যায়, ভোগ্যঋণ দিয়ে সুদ আদায়ের ক্ষেত্রে যে বে-ইনসাফি ও অমানবিকতা রয়েছে তা উৎপাদনশীল বাণিজ্যিক ঋণের ক্ষেতে নেই। সুতরাং বাণিজ্যিক সুদ ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। এ ব্যাপারে ইসলামী শরী-আহর বিধান কী?

উত্তর: ইসলামে ভোগ্যঋণের সুদ যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি উৎপাদনশীল বাণিজ্যিক ঋণের সুদও নিষিদ্ধ। কেননা, রিবা বা সুদ নিষিদ্ধ সংক্রান্ত আয়াতে সব ধরণের সুদই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সুদ নিষিদ্ধ করার বিষয়টি এর দাতা-গ্রহীতার আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল করা হয়নি। কেননা, ইসলামে কোনো আর্থিক ও বাণিজ্যিক লেনদেনের বৈধতা লেনদেনকারীদের আর্থিক অবস্থার উপর নির্ভর করে না। যেমন, বেচাকেনা একটি বৈধ বিষয়। এটি সবার জন্যই বৈধ এবং এ থেকে মুনাফা অর্জন করাও সবার জন্য বৈধ। এখানে ধনী-গরীবের মধ্যে কোনো প্রকার পার্থক্য করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে এ কথা বলা যাবে না যে, ধনী লোকের কাছ কোনো পণ্য বিক্রয় করে মুনাফা নেয়া হালাল, কিন্তু গরীব লোকের কাছে থেকে মুনাফা আদায় করা হালাল নয়। একইভাবে জুয়া খেলা, মদ খাওয়া, ঘুষ নেয়া ইত্যাদি ধনী-গরীব সবার জন্যই নিষিদ্ধ। এক্ষেত্রে বলা। ঠিক নয় যে, এগুলো ধনীদের জন্য বৈধ আর গরীবদের জন্য বৈধ নয়।

যারা বলে, শুধু ভোগ্যঋণের ওপর সুদ আদায় করা অবৈধ, তারা কি ভোগ্য ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করতে সক্ষম হবে? প্রকৃতপক্ষে ভোগ্যঋণের সীমা নির্ধারণ করা একটি জটিল বিষয়। কেননা, গরীব লোকও ভোগ্যঋণ গ্রহণ করে আবার ধনী লোকও ভোগ্যঋণ গ্রহণ করেন। ভোগ্যঋণকে যদি মানুষের জীবনধারণের জন্য আবশ্যকীয় পণ্যসামগ্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে তা ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ভিন্ন হতে বাধ্য। যেমন, কোনো ধনী লোক ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য মূল্যবান মোটর গাড়ি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সুদমুক্ত ঋণ দাবি করতে পারে। একই ভাবে বসবাসের জন্য বিলসবহুল ফ্ল্যাট নির্মাণের জন্য কোটি কোটি টাকার সুদমুক্ত ঋণ দাবি করতে পারে। ভোগ্যঋণের ওপর সুদ আদায় করা হারাম হলে তাদেরকে সুদমুক্ত ঋণ দেয়াই আইনত বৈধ হওয়ার কথা। এই যুক্তিতে একজন বাদাম বিক্রেতা তার ব্যবসার অল্প পরিমান ঋণের আবেদন করলেও তার কাছ থেকে সুদ আদায় করা বৈধ হয়ে যায়। কারণ, বাদাম বিক্রেতার গৃহীত ঋণ ছিল বাণিজ্যিক ঋণ, ভোগ্যঋণ নয়। এটা কাঙ্খিত নয়।

সুদের নিষেধাজ্ঞাসূচক আয়াতেও ভোগ্যঋণ ও বাণিজ্যিক ঋণের মধ্যে পার্থক্য করা হয়নি। হাদীসেও এরূপ কোনো পার্থক্যের কথা উল্লেখ করা হয়নি। আল কুরআনে সুদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে সাধারণ ভাষায়, এর মধ্যে সব ধরনের সুদই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, কুরআন নাযিলের সময় তা প্রচলিত থাক বা না থাক। প্রকৃতপক্ষে কুরআনে যখন কোনো লেনদেনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় তখন সে নিষেধাজ্ঞা শুধু উক্ত লেনদেনের বিশেষ ধরনের ওপর বর্তায় না, বরং সে নিষেধাজ্ঞা দ্বারা উক্ত লেনদেনের মৌলিক ধারণাকেই নিষিদ্ধ করা বুঝায়। যেমন, ইসলামে মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ নিষেধাজ্ঞা শুধু কোনো বিশেষ ধরনের মদের ওপর বর্তায় না; বরং এ নিষেধাজ্ঞা সব ধরনের মদের ওপরই বর্তায়। মদ নিষিদ্ধ হওয়ার হুকুম থেকে এ কথা বলা সঙ্গত নয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় প্রচলিত মদই শুধু হারাম এবং পরবর্তীকালে যে মদ প্রচলিত হবে তা হারাম হবে না। একইভাবে জুয়া নিষিদ্ধ করার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, শুধু সে কালে প্রচলিত জুয়াই নিষিদ্ধ; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের সব ধরনের জুয়াই নিষিদ্ধ।

ওপরের আলোচনা থেকে এ কথা সুষ্পষ্ট হয় যে, সুদ হারাম হওয়ার বিষয়টি যেমন ঋণগ্রহীতার আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল নয়, তেমনি তা ঋণ গ্রহণের উদ্দেশ্যের ওপরও নির্ভরশীল নয়; বরং সব ধরনের সুদ সব সময়ই হারাম।

 ব্যাংকিং সুদ হারাম কি না

প্রশ্ন-১২: বর্তমানে কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ মনে করেন যে, ব্যাংকিং সুদ হারাম নয়। কেননা, রাসূলুল্লাহর সা. সময় ও তাঁর আগমনের আগে ব্যাংকের অস্তিত্ত্ব ছিল না। সে সময় বাণিজ্যিক ঋণেরও প্রচলন ছিল না, মানুষ তার খাওয়া পরার চহিদা পূরণের জন্য বাধ্য হয়েই কেবল ঋণ গ্রহণ করত। তাদের এ তথ্য সঠিক হলে আধুনিক ব্যাংকিং সুদ নিষিদ্ধ হয় কিভাবে?

 উত্তর: আল কুরআনে সুদ সম্পর্কে যেসব আয়াত এসেছে সেখানে সুদের কোনো শ্রেণীবিভাগ করা হয়নি। ফলে সব ধরনের সুদই হারাম। ব্যাংকিং সুদ, ভোগ্যঋণের সুদ ও বিনিয়োগ সুদ বা ব্যবসার জন্য গৃহীত ঋণের সুদের মধ্যে পার্থক্য করার বিষয়টি একটি নতুন ধারণা। এ ধারণার প্রবর্তকদের মতে, শুধু ভোগ্যঋণের সুদ হারাম আর ব্যাংকিং সুদ বা বিনিয়োগ সুদ হালাল। তাদের এ ধারণা উম্মাহর সব আলিম ও ফকিহদের মতামত থেকে ভিন্ন। তাদের মতের ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহর সমর্থন নেই। কেননা, মহান আল্লাহ সব ধরনের সুদ হারাম করেছেন। এ ব্যাপারে আল কুরআনের চূড়ান্ত ঘোষণা, আল্লাহ ব্যবসাকে হালালা করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম। (কুরআন, ২:২৭৫)

তা ছাড়া যারা মনে করেন যে, ব্যাংক খৃষ্টীয় ১৭ শতকের উদ্ভাবন তাদের এ ধারণা ঐতিহাসিক গবেষণার মাধ্যমে ভুল প্রমাণীত হয়েছে। এ বিষয়ের বস্তুনিষ্ঠা গবেষণা থেকে জানা যায় যে, খৃষ্টের জন্মের ২০০০ বছর আগেও ব্যাংকিং লেনদেন চালু ছিল। ( মুফতি মুহাম্মদ তকি উসমানী, সুদ নিষিদ্ধ, পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের রায়, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮)

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা থেকে ব্যাংকব্যবস্থার গোড়ার ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় যে, “ব্যাবিলনবাসী খৃষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দেই ব্যাংকব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। তবে এর পেছনে ছিল সুপ্রতিষ্ঠিত ও বিপুল সম্পদের অধিকারী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব প্রতিষ্ঠান তাদের আনুষঙ্গিক কাজ হিসাবেই ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল। খৃষ্টপূর্ব ৫৭৫ অব্দ পর্যন্ত ব্যাবিলনে ‘দি ইজিবি ব্যাংক অব ব্যাবিলন’ নামে একটি ব্যাংক ছিল। (প্রাগুক্ত,পৃ.৩৮-৩৯) এই ব্যাংকের রেকর্ডপত্র থেকে জানা যায়, ব্যাংক গ্রাহকদের ক্রয় প্রতিনিধি ক্ষেতের ফসল জামানত হিসাবে গ্রহণ করত। এ ছাড়াও ব্যাংকটি ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে মূল্যবান জিনিস জামানত হিসাবে জমা রেখে ঋণ দিত এবং সুদের বিনিময়ে আমানত গ্রহণ করত। 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের অতি নিকটবর্তী সময়েও বাইজেন্টাইন সম্রাট শাসিত সিরিয়ায় সব ধরনের শিল্প-বাণিজ্য ও কৃষি খাতে সুদভিত্তিক ঋণের প্রচলন ছিল। সে সময় সুদভিত্তিক ঋণের এতই ব্যাপকতা ছিল যে, সম্রাটকে সুদের হার নির্ধারণ পূর্বক আইন জারি করতে হতো। সে সময় সিরিয়ার সাথে আরববাসী, বিশেষ করে মক্কার অধিবাসীদের সুদীর্ঘ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। এ বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে আরববাসীও বাণিজ্যিক সুদ সম্পর্কে ছিল পূর্ণসচেতন। এ ছাড়া তৎকালীন আরববাসীদের ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, সে সময় ভোগ্যঋণের প্রচলন ছিল, তেমনিই বাণিজ্যিক ঋণেরও প্রচলন ছিল। ড. জাওয়াদ আলী জাহিলি যুগের আরবদের ওপর গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে,  সে সময় সবাই মিলে  মুনাফার আশায় বাণিজ্য কাফেলাকে ঋণ দিত। (প্রাগুক্ত, পৃ.৪৪) ইবনু জারির আত-তাবারি লিখেছেন বনু আমর গোত্র বনু আল-মুগিরা গোত্রের কাছ থেকে সুদ আদায় করত। (প্রাগুক্ত) ইমাম বুখারী একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। সেখানে দেখা যায় যে, এক ইসরায়েলি অন্য এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১০০০ দিরহাম ঋণ নিয়ে সমুদ্রযাত্রায় বের হয়েছিলেন। (প্রাগুক্ত, পৃ.৪৬) অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, এ ঋণ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা হয়েছিল। (ফাতহুল বারি, (খ.?? পৃ. ৪৭১)। আরো দেখুন-মুফতি মুহাম্মদ তকি উসমানী, সুদ নিষিদ্ধ, পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের রায়, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬) 

রাসূলুল্লাহ সা. সময় যেমন প্রাতিষ্ঠানিক বাণিজ্যিক ঋণের প্রচলন ছিল, তেমনি ব্যক্তিপর্যায়েও বাণিজ্যিক ঋণের প্রচলন ছিল। এ বিষয়ে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি হলো: 

ক. রাসূলুল্লাহ সা. চাচা ও তার অন্যতম শত্রু আবু লাহাব বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। কারণ, সে অসি বিন হিশামকে সুদের ভিত্তিতে ৪ হাজার দিরহাম ঋণ দিয়েছিল। কিন্তু সে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে আবু লাহাব তাকে এ ঋণের বিনিময়ে ভাড়া করে তার বদলে বদরের যুদ্ধে পাঠিয়েছিল। এটা নিশ্চিত যে, এ ঋণ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই গৃহীত হয়েছিল বরং ব্যবসায় লোকসান দিয়ে ঋণগ্রহীতা দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। (আল-সুহাইলি, আল রাউদ আল উনুফ, খ.২, মুলতান, ১৯৭৭ পৃ. ৬২) 

খ.মুসলমানদের মধ্যেও বাণিজ্যিক ঋণের প্রচলন ছিল। যেমন ইমাম বুখারী রা. উল্লেখ করেছেন, মৃত্যুকালে হযরত যুবায়ের রা. এর দেনার পরিমাণ ছিল ২২ লাখ দিরহাম। এ অর্থ বাণিজ্যিক প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। (মুফতি মুহাম্মদ তকি উসমানী, সুদ নিষিদ্ধ, পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের রায়, প্রাগুক্ত পৃ.৪৭) 

গ. ইবনু সা’দ লিখেছেন, হযরত ‘উমর রা. সিরিয়ায় বাণিজ্য কাফেলা প্রেরণের উদ্দেশ্যে আবদুর রহমান ইবনু আউফ রা. এর কাছ থেকে ৪ হাজার দিরহাম ধার নিয়েছিলেন। (প্রাগুক্ত) 

ঘ. ইবনু জারির লিখেছেন, আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা হযরত উমর রা. এর কাছ থেকে ৪ হাজার দিরহাম ঋণ গ্রহণ করেছিল। (প্রাগুক্ত) 

ঙ. বায়হাকিতে বর্ণিত রয়েছে যে, হযরত মিকদাদ উবনু ‘আসওয়াত রা. হযরত উসমান রা. এর কাছ থেকে

৭ হাজার দিরহাম ধার গ্রহণ করেছিলেন। (প্রাগুক্ত) 

চ. ঘাতকের আঘাতে মারাত্মক আহত অবস্থায় হযরত উমর রা. এর দায়দেনা হিসাব করে দেখা যায় যে, তার ঋণের পরিমাণ ছিল ৮০ হাজার দিরহাম। (প্রাগুক্ত) 

ছ. ইমাম মালিক রা. তার মুয়াত্তায় বিস্তারিতভাবে যে ঘটনা উল্লেখ করেছেন তার সারমর্ম হলো, হযরত উমর রা. এর দুই ছেলে আবদুল্লাহ ও উবায়দুল্লাহ রা. যুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে ইরাকে গিয়াছিলেন। ফেরার পথে তারা বসরার গভর্নর আবু মুসা আশয়ারি রা. এর সাথে দেখা করেন। গভর্নর তাদের মাধ্যমে মদিনায় হযরত উমর রা. এর কাছে কিছু সরকারি অর্থ পাঠিয়ে ছিলেন। গর্ভনর উক্ত অর্থ দিয়ে ইরাক থেকে পণ্যসামগ্রী ক্রয় করে মদিনায় বিক্রয়ের মাধ্যমে প্রচুর মুনাফা অর্জন করেছিলেন। এর পর তারা ঋণের আসল অর্থ হযরত উমর রা. এর কাছে  পৌঁছে দিলে তিনি (উমর) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, হযরত আবু মুসা আশয়ারি কি সেনাবাহিনীর সবাইকেই এভাবেই ঋণ দিয়েছেন? তারা উত্তর দিলেন ‘না’। তখন উমর রা. বললেন, আমার সাথে তোমাদের সম্পর্কের কারণেই তিনি তোমাদেরকে এভাবে ঋণ দিয়েছেন। সুতরাং তিনি (উমর) তাদেরকে ঋণের আসল সাথে মুনাফাও জমা দেয়ার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু উবায়দুল্লাহ ইবনু উমর রা. আপত্তি জানিয়ে বললেন, এ নির্দেশ ন্যায়সঙ্গত নয়। কেননা, তারা ঋণের অর্থ দিয়ে যে পণ্যসামগ্রী ক্রয় করেছেন তা পথের মধ্যে বিনষ্ট হলে এর দায় তাদের ওপর বর্তাত এবং সব অবস্থায় ঋণের আসল অর্থ তাদেরকে পরিশোধ করতে হতো। কিন্তু হযরত উমর রা. তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় থাকলেন এবং অর্জিত মুনাফা বায়তুল মালে জমা দিতে নির্দেশ দিলেন। তখন উপস্থিতদের মধ্য থেকে একজন হযরত উমর রা. কে পরামর্শ দিলেন যে, এ লেনদেনকে মুদারাবা কারবারে রূপান্তর করতে পারেন এবং অর্জিত মুনাফার অর্ধেক আবদুল্লাহ ও উবায়দুল্লাহ রা. কে দিয়ে বাকি অর্ধেক বায়তুলমালে জমা করতে পারেন। হযরত উমর রা. এ পরামর্শ গ্রহণ করলেন এবং এ মোতাবেক মুনাফা বন্টন করে দিলেন। এ ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত ঋণ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হয়েছিল। (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮) 

উল্লেখিত ঋণের বিভিন্ন পরিমাণ ধরন থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, উক্ত  ঋণগুলো শুধু ব্যক্তিগত ভোগের চাহিদা পূরণের জন্য ছিল না, বরং এগুলো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেও ছিল। কাজেই এ কথা সঠিক নয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কিরাম রা. এর কাছে সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার সময় আরবে বাণিজ্যিক ঋণের প্রচলন বা এ সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। ওপরের আলোচনা থেকে সুষ্পষ্টভাবে বলা যায় যে, কুরআন নাযিলের সমসাময়িক কালে আরববাসীর কাছে বাণিজ্যিক সুদের ধারণা সুস্পষ্ট ছিল। তাই এ কথা বলার কোনো অবকাশ নেই যে, কুরআন যে সুদ নিষিদ্ধ করেছে তা কেবল ভোগ্যঋণের সুদ, বাণিজ্যিক বা ব্যাংকিং সুদ নয়। প্রকৃতপক্ষে সব ধরনের সুদই ইসলামে নিষিদ্ধ।(ক্রমশ:)


লেখক : (সংকলিত)
সংস্কার ২৩৯ ডিসেম্বর ২০১৮