সম্পাদকীয়

আজ ১৪ এপ্রিল। বাংলা সনের প্রথম দিন। পহেলা বৈশাখ। পৃথিবীর কোন বাংলা ভাষাভাষি সমাজে কিছু ঘটুক বা না ঘটুক বাংলাদেশে কিন্তু আজ ঘটবে মহাযজ্ঞ। এই দিনের জন্যে চৈত্রের আগমনের সাথে সাথেই শুরু হয় এই মহা আয়োজন। .......

বিস্তারিত পড়ুন

আল-কুরআন

৩৭. তার কথার প্রসঙ্গে তার সাথি তাকে বললো; তুমি কি তোমার সেই মহান স্রষ্টার প্রতি কুফুরি করলে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে, তারপর নোতফা (শুক্রবিন্দু) থেকে, তার পরে মানুষের আকৃতি দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কর.......

বিস্তারিত পড়ুন

আল-হাদীস

হযরত আবু যার রা. হতে বর্ণিত আছে যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির উপর অবশ্য কর্তব্য যে, তার শরীরের প্রত্যেকটি জোড়ের সুস্থতার শোকর স্বরূপ প্রত্যহ সকা.......

বিস্তারিত পড়ুন
Card image cap

অফুরান ভালোবাসা প্রিয় কবি আল মাহমুদ

মুজতাহিদ ফারুকী

মুজতাহিদ ফারুকী

১৫ ফেব্রুয়ারী লোকান্তরিত হলেন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক কবি আল মাহমুদ। কবিতার অঙ্গনে এ নামটি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। সন্দেহ নেই কবি আল মাহমুদ বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি। অনেকের বিবেচনায় জীবনানন্দ দাশের পর তিনিই বাংলা ভাষার প্রধান কবি। এই বিবেচনার কতটা অতিরঞ্জন বা কতটা তাৎক্ষণিক মুগ্ধতাজনিত অনুরাগ সক্রিয় সেটি সময় বিচার করবে। কারণ, বিপুল খ্যাতি অর্জন করলেও তার কাব্যকৃতি এখনো সার্বিক ও অনুপুঙ্খ মূল্যায়নের অপেক্ষায়।

কবি আল মাহমুদ জীবদ্দশায়ই রাজনৈতিক কারণে বিতর্কিত ছিলেন। বিতর্কিত ছিলেন বাম ঘরানার চিন্তা-চেতনা থেকে তার আদর্শিক বাঁক বদলের অভিঘাতে। রাজশক্তির সাথে তার মেলামেশাও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বেশুমার। অনেকে তাকে বর্জন করেছেন অতিশয় নির্মমতার সাথে এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এক রকম নির্বাসিত ও একঘরে হয়ে থেকেছেন। এমনকি মৃত্যুর অমোঘ আহ্বানে সাড়া দিয়ে দুলে ওঠা মায়াবী পর্দার সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও তিনি থেকেছেন উপেক্ষিত ও প্রাপ্য মর্যাদাবঞ্চিত। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার যে শেষ সম্মানটুকু প্রাপ্য ছিল, সেটুকু দেয়ার মতো সামান্য ঔদার্যও আমাদের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। ভাষার মাসে বাংলা ভাষার একজন শ্রেষ্ঠ কবির লাশ জাতীয় শহীদ মিনারে নিয়ে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সুযোগ করে দিতেও ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান রাজশক্তি। বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে লাশ দাফন করতে দেয়া হয়নি। এমনকি নিয়ম মাফিক সামান্য একটি শোকবার্তা দেয়ার মতো সৌজন্যবোধও তাদের নেই। এতটাই সঙ্কীর্ণ ও ক্ষুদ্র মনোবৃত্তি নিয়ে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তাদের কাছে আর কী আশা করার থাকে?

আমরা বলতে চাই কবি আল মাহমুদের আদর্শগত অবস্থান পরিবর্তন যতই বিস্ময়কর হোক না কেন, এটি একটি বাস্তবতা। পৃথিবীতে বহু কবি-সাহিত্যিকের নাম নেয়া যাবে, যারা আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে গিয়ে পুরো বিপরীত আদর্শে দীক্ষিত হয়েছেন। ধর্মীয় ভাবধারায় কবিতা লিখেও যথাযোগ্য কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছেন, এমন কবির সংখ্যাও কম নয়। শেষ জীবনে আল মাহমুদ তার কবিতার উপজীব্য করেছেন ইসলামী অনুষঙ্গ এবং যথেষ্ট শক্তিমত্তার সাথে সম্পূর্ণ শৈল্পিক মান সমুন্নত রেখেই সেটা করেছেন। আধুনিককালের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের কাছে মগজ বন্ধক রাখা বুদ্ধিজীবী বা সমালোচকদের কাছে তার শিল্পমূল্য তাৎক্ষণিকভাবে বুঝে ওঠা একটু কঠিনই। জসীম উদ্দীনের বালুচরের কাব্যশৈলী পশ্চিমা কাব্যকলার সৌন্দর্যে মুগ্ধ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথও হৃদয়ে ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন এটা তো সর্বজ্ঞাত।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যেভাবে একদলীয় ও একনায়কতন্ত্রী শাসনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার মূল চেতনা গণতন্ত্র, সাম্যবাদ ভূলুণ্ঠিত করা হয় তাতে অনেক মুক্তিযোদ্ধার মতো আল মাহমুদেরও মনে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে ওঠে। সেই ক্ষোভের বহি:প্রকাশ ঘটে তার রাজনৈতিক আচরণে। দৈনিক গণকণ্ঠের সম্পাদক হিসেবে তিনি প্রতিবাদী ভূমিকা রাখেন, যা আসলে একজন কবির সাংস্কৃতিক লড়াইয়েরই সম্প্রসারণ মাত্র। এ জন্য তার জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়, তাকে জেল-জুলুম-নির্যাতন ভোগ করতে হয়। স্বদেশভূমির রাজনৈতিক বিচ্যুতি সংস্কারের এই প্রয়াসে আত্মনিয়োগের কারণে জুলুমের শিকার হওয়া নি:সন্দেহে গৌরবের। আল মাহমুদ চিরকাল এই গৌরবের অংশভাগী হয়ে থাকবেন।

আমরা মনে করি, একজন কবি বা শিল্পীকে মূল্যায়ন করতে হবে একমাত্র এবং শুধু তার শিল্পের মানদণ্ডে। কবি আল মাহমুদকে বিচার করতে হবে তার কবিতা দিয়ে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পুরো ৯ মাস সরকারি পত্রিকায় চাকরি করে অর্থাৎ হানাদার শাসকগোষ্ঠীকে মদদ জুগিয়ে একজন কবি যদি সেরা কবির অভিধা পেতে পারেন, তাহলে মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মাহমুদের মূল্যায়নে এত দ্বিধা, এত আপত্তি, এত বিরোধিতা কেন? প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দু’টি,

আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনকালে সঞ্চয় করিনি

আহত বিক্ষত করে চারদিকে চতুর ভ্রুকুটি;

ভালোবাসা দাও যদি আমি দেব আমার চুম্ব্ন,

ছলনা জানিনা বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি;

পৌরুষ আবৃত করে জলপাইর পাতাও থাকবে না;

তুমি যদি খাও তবে আমাকেও দিও সেই ফল

জ্ঞানে ও অজ্ঞানে দোঁহে পরস্পর হব চিরচেনা

পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয়না কবিরা;

দারুণ আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা

 একজন কবির কাব্যের মূল্যায়নে কোন বিষয়টি প্রাধান্য পাওয়া উচিত, সে বিষয়ে আমরা এখানে শিবনারায়ণ রায়ের একটি প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি দিতে চাই। সম্প্রতি একটি অনলাইন মিডিয়ায় প্রকাশিত ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর লেখা থেকে নিয়েছি। তিনি লিখেছেন, আশির দশকের শুরুতে ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকায় আল মাহমুদের কবিতা প্রকাশ করতে গিয়ে বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন শিবনারায়ণ রায়। ২০০৬ সালে তার কলকাতার বাসভবনে কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিলাম: জিজ্ঞাসার বিভিন্ন সংখ্যায় কবি আল মাহমুদের অনেক কবিতা আপনি প্রকাশ করেছেন। সন্দেহ নেই, আল মাহমুদের কবিতা আপনার পছন্দের। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী এ ব্যাপারে আপনাকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করেন। ধরুন, কবি শামসুর রাহমানের কথা। তার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী শুনতে চাই।

উত্তরে শিবনারায়ণ রায় বলেছিলেন, ‘জিজ্ঞাসা’-এর পাতায় বাংলাদেশের তরুণ-প্রবীণ অনেক কবিরই কবিতা সাদরে মুদ্রিত হয়েছে। শামসুর রাহমানেরও। বাংলাদেশের কবি ও সাহিত্যিকদের লেখার সাথে আমার সম্যক পরিচয় বহু আগে থেকেই। পূর্ববঙ্গের কবিদের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা পূর্বাপর প্রত্যক্ষ করেছি। এটি ঠিক, আল মাহমুদের কবিতা আমাকে বেশ মুগ্ধ করে। আল মাহমুদের কবিতা নিয়েও ‘জিজ্ঞাসা’র বিরুদ্ধে অনেকের অসন্তুষ্টি বা অভিযোগের কথাও আমার অজানা নয়। ‘জিজ্ঞাসা’র তৃতীয় সংখ্যায় আল মাহমুদের একগুচ্ছ কবিতা মুদ্রিত হয়। সেটি ১৯৮২ সালের কথা। আমি চিঠি লিখে আগ্রহ ভরে কবিতাগুলো চেয়ে নিয়েছিলাম। আল মাহমুদের কবিতাগুলো দেখে অনেকেই চিঠি লিখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন যে, আল মাহমুদের পৃষ্ঠপোষকতা সমীচীন হয়নি। কারণ, সম্প্রতি তিনি এক দিকে ইসলামী ভাবধারায় দীক্ষা নিয়েছেন, অন্য দিকে সামরিক শাসকগোষ্ঠীর সমর্থক হয়ে উঠেছেন। কিন্তু কবির কার্যকলাপ দিয়ে কবিতার মূল্যায়ন মেনে নিতে পারিনি আমি। তাই কয়েক সংখ্যা পর আল মাহমুদের আরো একগুচ্ছ কবিতা প্রকাশ করি। আর সম্পাদকীয় মন্তব্যে এ কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিই-আল মাহমুদের কবিতা উপভোগ এবং তার বিশ্বাস বা কার্যকলাপকে সমর্থন করা সমার্থক নয়। এ কথা সত্য যে, আশির দশকের শুরু থেকে আল মাহমুদের মনোজগতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল।

তবে কবিতায় তার কল্পনার উদ্ভাস, মননশীল গভীরতা, উপমা-বাকপ্রতিমার মৌলিকত্ব অটুট থেকেছিল। আমার প্রতীতি ছিল যে, ধর্মবিশ্বাস বা রাজনৈতিক দিকদর্শন তার কবিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম হবে না। কারণ তিনি অস্থিমজ্জায় কবি, বিশুদ্ধ একজন কবি। তার কাব্যপ্রতিভা মৌলিকত্বে উজ্জ্বল। রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কাউকে অবদমনের দাবি বা প্রচেষ্টা আমার পক্ষে সমর্থন করা সম্ভব নয়। মানুষের মুক্তি ও গণতন্ত্রÑএ দুই অভীষ্ট থেকে আমি সজ্ঞানে কক্ষচ্যুত হইনি কখনো। আল মাহমুদের সাম্প্রতিক কবিতাও আমাকে মুগ্ধ করে, স্পর্শ করে; মনের গভীরে আলো জ্বেলে দেয়, যার কোনো ব্যাখ্যা নেই।”

বাংলা সাহিত্য জগতে বিবেক প্রতিম ব্যক্তিত্ব শিব নারায়ণের এই বক্তব্যের পর কবি আল মাহমুদকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিদ্যমান কূপমণ্ডূকতার অবসান ঘটবে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। ভাবছিও না। আমরা শুধু বলব, মেঘ হয়তো কিছুক্ষণের জন্য সূর্যের দীপ্তিকে আড়াল করতে পারে, সর্বকালের জন্য নয়। আল মাহমুদ বাংলা কবিতার সূর্য। তার কবিতার অপ্রতিরোধ্য চুম্বকীয় শক্তি কেউই উপেক্ষা করতে পারেন নি। তা সে রাজনৈতিকভাবে যে দলেরই হোক না কেন। রাজনৈতিক কারণে তাকে যখন প্রত্যাখ্যান করা হয়, তখনো তাকে ‘বাংলা ভাষার শক্তিশালী কবি’ বলে উল্লেখ করার পরই তা করা হয়।

আল মাহমুদের কাব্যযাত্রা আজীবন বাংলার প্রকৃতির মধ্য দিয়ে। এক দিকে বাংলার প্রকৃতির প্রাণচাঞ্চল্য, সৌন্দর্য, বিশালতা, বর্ণবৈভব অর্থাৎ নান্দনিক ও দার্শনিক রূপ; অন্য দিকে প্রকৃতি জীবন-জীবিকার অবলম্বন, ধ্বংসাত্মক হিংস্রতা বা বাস্তব রূপে বিরাজমান। এ দুই রূপ তার কাব্যে বিশেষ ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। কারণ কবির প্রধান বিষয় নারী; তারপরই প্রকৃতি। তবে এই প্রকৃতি পশ্চিম বাংলার নয়, পূর্ববাংলার। হুমায়ুন কবির নির্দেশিত পদ্মা-মেঘনা-যমুনার অবিরাম স্রোতধারায় নতুন জগতের সৃষ্টি ও পুরনোর ধ্বংসময় পূর্ব বাংলার প্রকৃতি তার আরাধ্য। আবার জীবনানন্দ দাশ ও জসীম উদ্দীনের কবিতায় অঙ্কিত প্রকৃতি আর আল মাহমুদের প্রকৃতি এক রকম নয়। কবি নিজেকে একজন চাষির সমগোত্রীয় মনে করেন; যার অন্যতম প্রধান বিবেচ্য হলো প্রকৃতি: বৃষ্টি, বৃষ্টিসিক্ত প্রাণময় ফলবান মাটি; যে মাটি সবুজ সীমাহীন ফসলের মাঠ ও জীবন-জীবিকার ভিত্তি গড়েছে। সেজন্য কবি ‘একটি চাষীর মত’‘সমস্ত প্রাকৃতিক আয়াত’ শিখেছেন। এখানেই প্রকৃতিকেন্দ্রিক কবির স্বতন্ত্র মনোভাব প্রকাশিত। বাংলা কবিতায় বহুদিন ধরে মুগ্ধ ও আবিষ্ট চোখে প্রকৃতি বর্ণনার যে ধারা চলে আসছিল, তার সাথে কবি প্রকৃতির বাস্তব ও স্বাধীন রূপের চিত্র আঁকেন। 

হাত বেয়ে উঠে এসো হে পানোখী, পাটিতে আমার

এবার গোটাও ফণা কালো লেখা লিখো না হৃদয়ে;

প্রবল ছোবলে তুমি যতটুকু ঢালো অন্ধকার

তার চেয়ে নীল আমি অহরহ দংশনের ভয়ে ।

এ কোন কলার ছলে ধরে আছো নীলাম্বর শাড়ি

দরবিগলিত হয়ে ছলকে যায় রাত্রির বরণ,

মনে হয় ডাক দিলে সে-তিমিরে ঝাঁপ দিতে পারি

আচঁল বিছিয়ে যদি তুলে নাও আমার মরণ ।

বুকের ওপরে মৃদু কম্পমান নখবিলেখনে

লিখতে কি দেবে নাম অনুজ্জ্বল উপাধিবিহীন ?

শরমিন্দা হলে তুমি ক্ষান্তিহীন সজল চুম্বনে

মুছে দেবো আদ্যক্ষর রক্তবর্ণ অনার্য প্রাচীন ।

 আল মাহমুদের কবিতায় বারবার একই সাথে প্রকৃতি ও নারীর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে। প্রকৃতির নান্দনিক-দার্শনিক রূপের অপর পিঠে আছে প্রকৃতির বাস্তব চিত্র। কৃষকদের চাষবাস করার এবং চাষবাসের মধ্যে জীবনযাপন করার অধিকার আছে। বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস পরিপূর্ণ হয়ে আছে কৃষকের জমি ও জমির ফসল দখলের কাহিনীতে। বৌদ্ধ যুগের অবসানে বাংলায় ব্রাহ্মণ্য শাসন, শোষণ, বর্ণপ্রথা, বিভেদ ইত্যাদি মানবতাবিরোধী কার্যক্রমের কারণে সমাজজীবনে শান্তি, সাম্য ও নিরাপত্তা ছিল না। কৃষকের উৎপাদিত শস্য লুণ্ঠিত হয়ে যেত। নারীর চেয়ে শস্যের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন সেই সময়ের বাঙালি কৃষকের আর্তি শোনা যায় ‘সোনালী কাবিন’-এ। প্রকৃতি ও নারীভাবনা ইতিহাসের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে একাকার হয়ে আছে।

প্রথম জীবনে কবি প্রকৃতির নান্দনিক ও দার্শনিক দিকটির প্রতি মনোযোগী হয়েছেন। প্রকৃতি সৌন্দর্য, মুগ্ধতা, অবসর, সূক্ষ্ম অনুভূতি, বোধ ইত্যাদির আঁধার; রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাশের কাব্য সৃষ্টি ও ভাবনার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রথম জীবনে কবির মধ্যে এ ধরনের মনোভাব সৃষ্টি হয়। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তরে’মূলত এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় মেলে। প্রকৃতির মধ্যে প্রকাশিত ও উৎসারিত সৌন্দর্য ও ধ্বনির প্রতি কবি মুগ্ধ হয়ে নিজেকে ‘ধ্বনির যাদুকর’ ও ‘জলপান শব্দের শিকারি’রূপে চিহ্নিত করেন। ‘কালের কলস’ থেকে তার চিন্তাধারা পাল্টাতে শুরু করে।

আল মাহমুদ ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বতন্ত্র ও স্বকীয়। শেষ পর্যন্ত কবি তাই প্রকৃতি বলতে দেশজননী বুঝেছেন। প্রথম পর্বে প্রকৃতি কবির কিষাণী নারী আর তৃতীয় পর্বে দেশ হলো কবির মা; মায়ের অঙ্গপ্রতঙ্গ হলো প্রকৃতি। তাই তার দেশ আর দেশের প্রকৃতি অভিন্ন। বঙ্গজননী আর প্রকৃতি অঙ্গাঙ্গিরূপে বিরাজমান। বস্তুত আল মাহমুদের নারী ভাবনা, স্বদেশ চেতনা ও প্রত্যাবর্তন, সমাজ চেতনা, ঐতিহ্যমুখিতা অর্থাৎ মৌলিক সব কিছুর পটভূমি হলো প্রকৃতি। গ্রামের চাষা-হালবলদ, লাউয়ের মাচায় সিক্ত নীল শাড়ির নিশান, দূরের নদী-হাটের নাও-মাঠ, জোনাক পোকা, ধানক্ষেত, ফুল-বসন্তের পাখি, নারীর ধানঝাড়া, ধানের ধুলোয় ম্নান শাড়ী ইত্যাদির মধ্যে কবির বসবাস। তাই কবি মানুষের বাসস্থান, লাউমাচা, নীলাম্বরী নিয়ে থাকতে চান। নদীর নাচের ভঙ্গি, পিতলের ঘড়া, হুঁকোর আগুন, চড়ুইয়ের বাসা, নিমডালে বসে থাকা হলুদ পাখি, পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ, মাছের আঁশটে গন্ধ, কুরুলিয়ার পুরনো কই ভাজা, সোনালি খড়ের স্তূপ, কলাপাতায় মোড়া পিঠার মতো হলুদমাখা চাঁদের জোছনাময় প্রকৃতির মধ্যে কবি বসতি গড়ে তোলেন।

ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর লেখা থেকে আরো একটি উদ্ধৃতি-‘আল মাহমুদের কবিতার অনুবাদ গ্রন্থ Selected Poems of Al Mahmud -এর ভূমিকায় অনুবাদক কবীর চৌধুরী লিখেছিলেন, His images are carefully wrought, and though mostly culled from the familiar rural world of Bangladesh, the reader finds them at once striking and graceful because of the way he manipulates his words and rhythm and the keen, sensuous, delicate sensibility he brings to bear on them’ কবীর চৌধুরীর অভিমত সব কাব্যরসিকের উপলব্ধির প্রতিধ্বনি ছিল।”

আল মাহমুদের মৌলিকতা এবং ঐতিহ্যবাদিতা সেই আবহমান বাংলায় ফেরার পিপাসায় এবং প্রত্যাবর্তনের লজ্জায়। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সব সঙ্কোচ, গ্লানি ও লজ্জার ঊর্ধ্বে। তাই তিনি গাঁয়েই ফিরে এসেছেন; গাঁয়ের জমিনে, নদীতে ও নিসর্গে। অর্থাৎ বাংলার প্রকৃতিলগ্ন জীবনে কবির বিচরণ ও আহরণ স্বচ্ছন্দ ও স্বাভাবিক।

১৯৬৮ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত কবি আল মাহমুদ আজ শরীরি অস্তিত্বে আর আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু রয়ে গেছে তার অমর কাব্য। আল মাহমুদের কাছে চিরঋণী হয়ে থাকবে বাংলা কবিতা ও বাংলা ভাষা।  বিনম্র শ্রদ্ধা ও অফুরান ভালোবাসা প্রিয় কবি আল মাহমুদ। (সৌজান্যে নয়া দিগন্ত)

সংস্কার ২৪১ মার্চ ২০১৯